Home / বিশ্ব / নর্তকী বিরকিল থেকে পর্দানশীল জামিলা

নর্তকী বিরকিল থেকে পর্দানশীল জামিলা

imageতিনি ছিলেন নর্তকী। উদ্দাম গানের তালে উত্তেজক নাচ নাচতেন। পানির মতোই মদ খেতেন। সপ্তাহে সপ্তাহে ককটেল পার্টি দিতেন। হাতে থাকতো সিগারেট। আর প্রায় প্রতি রাতেই বাড়িতে ডেকে আনতেন নতুন নতুন পুরুষ। তার নাম ছিলো ক্যাইরি বিরকিল।
ছিলো মানে ছিলো, বর্তমানে নেই। এখন তার নাম জামিলা। হ্যাঁ, মুসলমান হওয়ার পর থেকে তার নামে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি দৈনন্দিন আচার আচরণেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইংল্যান্ডের নটিংহামের ৩৭ বছর বয়সি এ নারী এখন বোরখা পড়েন। ভুলেও মদ ছুঁয়ে দেখার কল্পনা করেন না। তিনি নিজেই এখন বুঝতে পারছেন, নারীদের শরীর স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের কাছে প্রদর্শনের জন্য নয়। ইসলাম নারীদের এ সম্মান দিয়েছে।
শুধু জামিলাই নন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তার তিন সন্তানও। ২০১৩ সালে আগের স্বামীর সাথে তার বিয়ে ভেঙ্গে যায়। বর্তমানে ৬, ১৬ এবং ১৮ বছর বয়সি তিন সন্তান রয়েছে। এরা সবাই ইসলাম ধর্মের নিয়ম মেনে চলছে।

এ পরিবর্তনটা কিভাবে হলো?
জামিলা বলেন, আমার বিয়েটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেই কলেজে ট্যুরিজমের ওপর পড়ালেখা করবো। এ কারণেই গত জানুয়ারিতে আমি পশ্চিম আফ্রিকার জাম্বিয়ায় ভ্রমণ করি। সেখানে দেখা হয় শরীফের সাথে।
শরীফ জালো নামের ২৮ বছর বয়সি এ তরুণই বদলে দিয়েছেন তার জীবন। তার সাথে আলাপ করেই ইসলামকে জানতে পেরেছেন। আর জড়িয়ে গেছেন প্রেমের সম্পর্কে। তিনি বলেন, শরীফ শিক্ষকতা করতো। সে আমার চেয়ে নয় বছরের ছোট। তারপরও প্রথম দর্শনেই আমাদের প্রেম হয়ে যায়। সে খুবই বুদ্ধিমান এবং অমায়িক। জাম্বিয়া ট্রিপের শেষ দিন আমি জানতে পারি সে আমাকে ভালোবাসে। এ কথা শুনে বিমানবন্দরে আমি তিন ঘন্টা কেঁদেছে|
এর পর যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেও তিনি শরীফের সাথে যোগাযোগ রাখলেন। প্রতি রাতেই তার সাথে ফোনে কথা বলতেন। এক সপ্তাহ পর শরীফ তাকে ইসলাম সম্পর্কে পড়ালেখা করার প্রস্তাব দেন। তিনিও কৌতুহলী হয়ে উঠেন। ইন্টারনেটে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়তে শুরু করেন।
পড়তে পড়তেই ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। অবশেষে গত জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নাম ধারণ করে মুসলমান হয়ে গেলেন। তবে তিন সন্তানকে মুসলমান হওয়ার জন্য মোটেও চাপ প্রয়োগ করেননি। বড় দুইজনকে বাছাই করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। পরে স্ব প্রনোদিত হয়ে এরাও তার ধর্মের পথেই পা বাড়ায়।

তিনি বলেন, শরীফসহ কয়েকজন মুসলিমের সাথে আলাপ করে আমি আমার নাম ঠিক করি ‘জামিলা’। এখন আমি বোরখা পড়ি। আগের বেপরোয়া জীবন নিয়ে আমি লজ্জিত। আমি প্রতি সপ্তাহেই বারলেস্কু ড্যান্স করতাম। কখনো আমার পরনে নিকার্স এবং নিপল টেসেলস ছাড়া কিছুই থাকতো না। হাল্কা সিল্কের পোশাক পড়ে উত্তেজক ভঙ্গিতে নাচতাম। মা হওয়ার আগে প্রায় প্রতি রাতেই বাড়িতে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষ নিয়ে আসতাম। অ্যালকোহলের মতো এটাও আমার কাছে স্বাভাবিক ছিলো। এখন অতিত ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, আমি নতুন করে জন্মেছি।

ইসলাম ধর্মের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি শান্তি, সহানুভ’তি, ভালোবাসা এবং দয়ার ধর্ম। এ ধর্মের সবকিছুর ওপরই আমি বিশ্বাস করি। ইন্টারনেটে পড়ালেখা করার পর বুঝতে পারলাম আমার মুসলমান হওয়া প্রয়ো
জন। আমার পুরনো ছবিগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, এসবের কোনোকিছুকেই ইসলাম সমর্থন করে না। তবে ইসলাম বিশ্বাস করে নারীর শরীর কেবল তার স্বামীর জন্য।
রমজানের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ মাসটি সব মুসলমানদের জন্য ইবাদত, উপবাস, দান খয়রাত এবং নিজেকে সংশোধনের জন্য লম্বা সময়।
জামিলা জানান, শরীফ ছিলো হৃদয়ভাঙ্গা এক মানুষ। সে তার অতীতের দুঃখ কষ্ট সব কথাই আমাকে খুলে বলেছে। এই ভাঙ্গা হৃদয়ের শরীফের সাথেই তিনি নতুন করে ঘর পেতেছেন। তবে বিয়ে করার পরও এখন তারা একসাথে থাকছেন না। শরীফ আছেন নিজেদের দেশ জাম্বিয়াতেই। আর জামিলা যুক্তরাজ্যে। জাম্বিয়া এবং যুক্তরাজ্যের দূরত্ব অনেক। তবে তাদের মনের দূরত্ব একেবারেই নেই। আপাতত ছোট ছেলেটার পড়ালেখার কথা ভেবেই তিনি জাম্বিয়ায় যেতে পারছেন না।
জামিলা বলেন, আমার ছোট ছেলেটার বয়স কম। এখন বাইরে চলে গেলে ওর পড়ালেখার ক্ষতি হবে। ওকে আমি স্কুলের বাইরে রাখতে চাচ্ছি না। তাই আমিও যুক্তরাজ্য ছেড়ে যেতে চাই না।
মুসলমান হওয়ার পর আত্মীয় ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া কী?
এ বিষয়ে জানালেন জামিলা নিজেই, আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে মুসলমান না হলে এবং শরীফকে না পেলে জীবনে সুখ বলতে কিছু আছে, তা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আমার বন্ধুরা এটাকে খুব ভালোভাবে নিচ্ছে না। আমি বোরখা পড়ে বাইরে গেলে অনেকেই বিরক্ত করে। তবে অনেক বন্ধুরাই অবস্থাটা মেনে নিয়েছে। কিন্তু অন্যরা আমাকে নতুন নামে ডাকবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, রাস্তায় বের হলে, স্থানীয় অনেকেই আমাকে জামিলা, জামিলা ডেকে উত্যক্ত করে। আমার সাবেক বন্ধুরাসহ কেউ কেউ সন্ত্রাসী বলেও ডাকে। মুসলমান হওয়ার কারণে আমি অনেক বন্ধু হারিয়েছি। তবে চমৎকার এক নতুন বন্ধু পেয়েছি। এ বন্ধু পাশে থাকলেই এক জীবনের জন্য যথেস্ট। এ ছাড়া স্থানীয় মুসলমানরা আমাকে স্বাগত জানিয়েছে। এখন ওরা আমাকে তাদের বাড়িতে দাওয়াত করে। সব মিলিয়ে নতুন জীবনে ভালোই আছি। আর এ ভালো থাকার কৃতিত্বটা শরীফেরই।

Leave a Reply