Home / প্রচ্ছদ / সরেজমিন মানিকগঞ্জ : অধিকাংশ কেন্দ্রে ‘হিডেন থ্রেটে’ বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট লাপাত্তা

সরেজমিন মানিকগঞ্জ : অধিকাংশ কেন্দ্রে ‘হিডেন থ্রেটে’ বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট লাপাত্তা

66988_1মানকগঞ্জে ৪টি উপজেলায় বুধবার নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে সাটুরিয়া, শিবালয়, দৌলতপুর এবং সিংগাইরের অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টই দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, সরকার সমর্থকদের ‘হিডেন থ্রেটে’ মনোনীত অনেক এজেন্ট ভোট দিয়েই এলাকা ছেড়ে গেছে। আবার কেউ কেউ ঘুরে ফিরে সাংবাদিকদের সহায়তায় ভোটকেন্দ্রে ফিরেছে শেষ বেলায়। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল উদ্যমহীন। কেন্দ্রের সামনে কেবল সরকার সমর্থকদের জটলা ছাড়া চিরাচরিত ভোটানন্দের কোনো নজির মিলেনি কোথাও। তবে ভোটারদের চেহারায় ছিল শঙ্কার ছাপ। ভোট দিয়েও ফলাফল পাল্টানোর শঙ্কা প্রকাশ করেছে অনেক ভোটার। গতকাল মানিকগঞ্জের ৪টি উপজেলায় বেশকিছু ভোট কেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শনে এসব চিত্র উঠে আসে।
মানিকগঞ্জের ৪ উপজেলায় অনেকটা শান্তিপূর্ণ ভোটে কেন্দ্রের মধ্যেও ছিল অনেক অসঙ্গতি। ভোটার তালিকাবিহীন এজেন্টদের বসে থাকতে দেখা গেছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। যাদের অনেকেই তাদের প্রার্থীর নামও বলতে পারেন না। এছাড়া জালভোট দেয়াসহ শেষ ঘণ্টায়
সিংগাইরের অন্তত ২০টি কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ করেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে ছিল সাইলেন্ট থ্র্রেট। ভোটারদের মধ্যে ছিল না কোনো আনন্দ-উল্লাস। কিছু কেন্দ্রে ছোটখাট লাইন চোখে পড়লেও বেশিরভাগে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম। প্রধান সড়কগুলোতে সেনা ও র্যাবের টহল দেখা গেলেও কেন্দ্রে পুলিশি নিরাপত্তা ছিল খুবই ঢিলেঢালা। অনেক কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের দেখা গেছে খোশগল্পরত, অলস সময় কাটাতে। আবার ভোটার তালিকায় ভুলত্রুটির কারণে অনেকেই ভোট দিতে না পেরে ফিরে যেতে দেখা গেছে। তবে সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্ট ও সমর্থকদের অনুপস্থিতি লক্ষ্যণীয় হলেও নীরব বিপ্লবের প্রত্যাশা করছেন বিএনপি নেতারা।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে সাটুরিয়া কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্রে গিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বশিরউদ্দিন আহমেদ ঠান্ডুর কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি। স্কুলের সামনে ভোটারদের ছোটখাট লাইন। ওই কেন্দ্রের ৫টি বুথ ঘুরে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর একজন এজেন্টও দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে প্রিসাইডিং অফিসার আবু বকর সিদ্দিক জানান, প্রতিটি বুথেই এজেন্ট ছিলো। কিন্তু অন্য এজেন্টরা জানান, প্রথমদিকে কয়েক মিনিট তারা বুথে বসলেও পরক্ষণেই তারা বেরিয়ে যান। ভোটগ্রহণের প্রথম দুই ঘন্টায় এ কেন্দ্রের ২২৮৫ ভোটের মধ্যে কাস্ট হয় ৩৫১ ভোট।
দুপুর ১২টার দিকে বালিয়াটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র গিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রের বাইরে মহড়া দিচ্ছিলেন সরকারি দলের কয়েকজন সমর্থক। তাদের তত্পরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে সেখানে দেখা যায়নি কোন বিএনপি সমর্থককে। কিছু দূরে ভোটার স্লিপ দিচ্ছিলেন কয়েকজন তরুণ। স্লিপ বিতরণকারী বিএনপি কর্মীরা জানান, যারা ভোটার স্লিপ দেয়ার কথা ছিল সকাল থেকে তারা কেন্দ্রের আশপাশে আসতে পারেননি। কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেল ৫টি বুথের মধ্যে মাত্র একটিই রয়েছে বিএনপি সমর্থক প্রার্থীর এজেন্ট। এ সময় থেকে বেরিয়ে আসছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ ফটো। তিনি বলেন, সাটুরিয়ার মানুষ শান্তশিষ্ট। এখানে নির্বাচনী সহিংসতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ বিগত ৫ বছর দলমত নির্বিশেষে কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গায়ে আচড় লাগতে দেইনি। এমনকি জামায়াতের ওপরও নয়। কেন্দ্রটিতে ২১০০ ভোট থাকলেও সেখানে ভোটারদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি।
বালিয়াটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সাবেরা সুলতানা জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৭০০ ভোট কাস্ট হয়েছে।
এই কেন্দ্রে কামাল ও আক্কাস আলীসহ বেশ কয়েকজনের ভোটার আইডি কার্ড থাকলেও ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় ভোট না দিয়ে চলে যেতে দেখা গেছে। আক্কাস জানান, আমার ভোটার আইডি নম্বর ৫৬১৭০২৯০৯১৬৫৩ হলেও এখানের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ঘুরেও তালিকায় নাম না থাকায় তিনি ভোট দিতে পারেননি।
এদিকে সাটুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, দুটি লাঠিতে ভর দিয়ে ও নাতির সহায়তায় ভোট দিতে যাচ্ছিলেন ৮৯ বছর বয়স্ক হাফেজ শাহাবুদ্দিন। তিনি জানান, শরীর অসুস্থ কিন্তু নিজের অধিকার আদায় করতেই তিনি কেন্দ্রে যাচ্ছেন। কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন সেটা প্রকাশ না করলেও দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসুক সেটাই প্রত্যাশা করলেন তিনি। সাটুরিয়ার বালিয়াটি আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ফুকুরহাটি কান্দাপাড়া মজিবর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় ও ফুকুরহাটি পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ অন্তত ১০টি কেন্দ্র ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।
দুপুর দেড়টার দিকে শিবালয় কেন্দ্রীয় আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বাইরে মহড়া দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা। সাংবাদিকদের দেখেই তারা জানান, পরিস্থিতি খুবই শান্তিপূর্ণ, কোন সমস্যা হচ্ছে না। তাদের কারও বুকে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রহিম খানের ব্যাচ। কিন্তু কেন্দ্রের আশপাশে চোখে পড়েনি বিএনপির কর্মী সমর্থকদের। কেন্দ্রের ভেতরে দেখা গেল চুপচাপ বসে আছেন এজেন্টরা। তাদের হাতে কোন ভোটার তালিকা নেই। কিন্তু একজনকে দেখা গেল বেশ তত্পর। তিনি প্রথমে নিজেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আকবরের এজেন্ট দাবি করলেন। কিন্তু একপর্যায়ে স্বীকার করলেন তিনি নিরপেক্ষ। কিন্তু নিরপেক্ষ ব্যক্তি কেন এজেন্টের আসনে বসে আছেন জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়েই তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়েন। পরে অন্য বুথেও দেখা গেল একই চিত্র। একটি বুথে দেখা গেল গোপনকক্ষ তৈরি করা হয়নি। প্রকাশ্যেই ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। প্রিসাইডিং অফিসার ইকবাল হোসেন জানান, ২৯৮৩ ভোটের মধ্যে দুপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২শ’ ভোট কাস্ট করা হয়েছে।
দুপুর ২টার দিকে আরিচা বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে দেখা গেছে অর্ধশতাধিক মানুষের মহড়া। কিন্তু ভেতরে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি নেই। বুথ ঘুরে দেখা গেল দুই প্রার্থীর এজেন্টই উপস্থিত আছেন। কিন্তু কোনো এজেন্টের সামনেই নেই ভোটার তালিকা। ভোটারদের শনাক্ত করতে তাদের কোন তত্পরতা নেই। কেবল বসে বসে দেখছেন। কেন্দ্রের ২ নম্বর বুথে দায়িত্ব পালন করছিলেন দুই তরুণী। বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট লতা বেগম ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এজেন্ট নাসিমা বেগম। তাদের কারও কাছেই ভোটার তালিকা নেই। তারা জানালেন, বুথের সব ভোটারদের তারা চেনেন না। এজেন্ট হিসেবে তাদের সামনে ভোটার তালিকা নেই কেন জানতে চাইলে তারা জানান, তাদের যেটুকু দায়িত্ব পালনের কথা বলেছে, তা পালন করছি। একই কেন্দ্রের ৩ নম্বর বুথেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে চারজন এজেন্টের একজনের সামনেও নেই ভোটার তালিকা।
প্রিসাইডিং অফিসার খন্দকার মাহবুবুল আলম জানান, কোন ধরনের সমস্যার মুখে পড়েননি তিনি। কেন্দ্রের মোট ২৩৪৫ ভোটারের মধ্যে তখন পর্যন্ত কাস্ট হয়েছে ৫০ভাগ। প্রায়ই একই দৃশ্য দেখা গেছে শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, তেওতা একাডেমি ও নিহালপুর রেজি: প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এছাড়া দাশকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্যনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় টেংগরহাটে বিএনপি সমর্থী এজেন্টদের বের করে দিয়ে জালভোট দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আকবর।
এদিকে সিঙ্গাইর উপজেলা নির্বাচনে শেষ ঘণ্টায় ১৬টি কেন্দ্রে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ করেছে বিএনপি। ১৯ দলীয় জোটের প্রার্থী আবিদুর রহমান খান নোমানের নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা অভিযোগ করেন, দিনভর পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও শেষ ঘণ্টায় পাল্টে যায় চিত্র। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মুশফিকুর রহমান খানের সমর্থকরা উপজেলার ধল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুটনগর, কামুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরদুর্গাপুর স্কুল, কমলনগর স্কুল, সিংগাইর ডিগ্রি কলেজ, আজিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘোনাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, খোলাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছোট কালিয়াকৈর প্রাথমিক বিদ্যালয়, নুর হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় ও কালিন্দী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে নেয়। এ সময় হান্নানের ঘোড়া প্রতীকে প্রতিটি কেন্দ্রেই ৫০০-৭০০ জাল ভোট দেয়া হয়। তবে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা নাসরিন।
এদিকে গতকাল মানিকগঞ্জের চারটি উপজেলা নির্বাচন পরিদর্শন করেন সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাই শিকদারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী ও ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক নাসিম সিকদারসহ ঢাকার আটজন সাংবাদিক। বেশ কিছু কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ শেষে আবদুল হাই শিকদার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে সুষ্ঠুভাব লক্ষ্য করা গেছে। কিছু কেন্দ্রে সরকারি দলের ‘হিডেন থ্রেট’-এর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিংগাইরে ১৬টি কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া সাটুরিয়া ও শিবালয়ের বেশিরভাগ কেন্দ্রে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টদের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।’

উৎসঃ   আমার দেশ

Leave a Reply